Tuesday, December 29, 2020

ভুয়া ঋণ : শাখা ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ ১ কোটি ২২ লাখঃ


ঢাকার দোহার উপজেলার অগ্রণী ব্যাংকের আন্তা:বাহ্রা শাখা থেকে কৃষি ঋণ দেয়ার নামে শত শত কৃষকের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে আন্তা:বাহ্রা শাখা ব্যবস্থাপক হুমায়ূন কবিরের বিরুদ্ধে। ফলে ব্যাংক থেকে কোনো ঋণ না নিয়েও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষকের নামে অসহায় ১২২ ঋণ গ্রহীতা।


এসব ঋণ গ্রহীতারা জানেন না তাদের নামে ব্যাংকে ঋণ নেয়ার কথা বা ঋণের পরিমাণই বা কত? নিয়ম অনুযায়ী ঋণ আবেদন এবং ঋণ উত্তোলনের সময় গ্রহীতাকে স্বশরীরে দস্তখত  করে টাকা উত্তোলন করার কথা কিন্তু এসব গ্রহীতা কেউই কোনো ফরম বা কাগজে কোনো সই দেননি। এমনকি কখনই এ শাখায় যাননি বা চেনেনই এ শাখার অবস্থান। সম্প্রতি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক অডিটে এ বিষয়টি ধরা পড়লে অসহায় দরিদ্র এসব মানুষের নামে ব্যাংক থেকে নোটিশ পাঠানো হয় ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করার জন্য। বিষয়টি জানতে পেরে রোববার দুপুরে এ শাখায় ঋণ গ্রহীতার তালিকা দেখতে জড়ো হতে থাকেন গ্রহীতারা। তালিকায় নিজের নাম দেখে হতবাক হয়ে যান হতদরিদ্র এ মানুষগুলো। ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখা থেকে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার সুব্রত কুমার রায়ের নেতৃত্বে ৪ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি সত্যতা খুজতে কাজ করছে।


 

এ বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্থরা নতুন শাখা ব্যবস্থাপক নাসির আহমেদের বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন। আন্তা:বাহ্রা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ শাখা থেকে এরিয়ার বাহিরে নিয়ম বহির্ভুতভাবে ১২২ জন ঋণ গ্রহীতাকে ১ কোটি ২২ লাখ টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়।


 

সূত্রে জানা গেছে, এ শাখায় ফিল্ড অফিসার থাকলেও শাখা সাবেক ব্যবস্থাপক হুমায়ূন কবির একাই সব দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে ২ তারিখে যোগদানের পর এই কর্মকর্তা প্রতিটি ইউনিয়নে দালাল নিযুক্ত করে দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ব্যাংক ম্যানেজার হুমায়ূন কবিরসহ এসব ঋণ বিতরণ করেন। নানা অনিয়মে হুমায়ূন কবিরকে দোহার উপজেলা শাখায় বদলি করা হয়। এর পূর্বে তিনি নবাবগঞ্জের চুড়াইন শাখায় ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানেও তিনি অনেক অনিয়ম করেন এবং  অনিয়মের অভিযোগে কোনো একসন না নিয়ে আন্তা:বাহ্রা শাখায় ইকরাশিতে বদলি করা হয়।


 

অগ্রণী ব্যাংকের আন্তা:বাহ্রা শাথার মাঠ কর্মকর্তা মো. ওয়াসিম জানান, কৃষি ঋণ দেয়ার আগে মাঠ পর্যায়ে আমাদের পরিদর্শণ করতে হয় কিন্তু এখানে সব ম্যানেজার নিজে অফিসে বসেই সব করতেন। তবে রুমে মাঝে মধ্যে কিছু দালালদের চলাচল লক্ষ করেছি।


 

নতুন শাখা ব্যবস্থাপক নাসির আহমেদ বলেন, আমি এ শাখায় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখে যোগদান করেছি। পূর্বে কে কি অনিয়ম করেছে সে বিষয়ে আমি কিছুই বলতে পারবো না। কতজন কৃষকের ঋণের বিষয়ে অডিট আপত্তি এসেছে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে যে সমস্ত কৃষকের মধ্যে হালনাগাদ (রিকভারি) ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল তাদের মধ্য থেকে কিছু কৃষকের নামে ব্যাংকের অভ্যন্তরীন নিরীক্ষা দল কর্তৃক আপত্তি এসেছে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আন্তা:বাহ্রা শাখা থেকে সাবেক ব্যবস্থাপক হুমায়ূন কবীরের দুই ছেলে আসলাম কবীর ও মাহমুদুল কবীরের নামে ২ লাখ, তার ভাই রেজাউল কবির আজাদ ও তার স্ত্রী শিমু আক্তারের নামে ১ লাখ টাকা ঋণ দেখিয়ে টাকা উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। যাদের বর্তমান ঠিকানা বরিশাল।

ভুক্তভোগীরা জানান, ত্রাণ দেয়ার জন্য স্থানীয়  নাজমা আক্তার নামে এক মহিলা তাদের কাছ থেকে ১১ টি ভোটার আইডি নিয়ে ব্যাংকে জমা দেয়। এরপর তারা ঋণ নেওয়ার বিষয়ে নোটিশ পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পরেন। অনেকেই জানেন না তাদের নামে কত টাকা ঋণ নেয়া হয়েছে। তাই গত ২৬ ডিসেম্বর অনেক ভুক্তভোগী আন্তা:বাহ্রা শাখায় ভীর জমায় তথ্য জানতে। এসময় অনেকে যখন জানতে পারেন তাদের সাথে প্রতারণা করে ঋণের বোঝাঁ চাঁপিয়ে দেয়া হয়েছে, তখন ব্যাংকের ভেতরেই কান্নায় ভেঙ্গে পরেন অনেকে।


 

 ইকরাসি এলাকার ছবি বেগম বলেন, আমি নাজমার কাছে বয়স্ক ভাতার জন্য ১৫’শ টাকা ও ভোটার আইডি দিয়েছি, আমার নামে কিভাবে ঋণ দিল, আমিতো কিছুই জানিনা। আল্লাহ এদের বিচার করবে। নজর আলী বিশ্বাস এর স্ত্রী ছবি বেগম জানান, আমরা তো এই ব্যাংক চিনি না অথচ আমাদের নামে ঋণ নিয়ে এর বোঝাঁ আমাদের উপর চাঁপিয়ে দিয়েছে। আমরা সরকারের কাছে এর বিচার চাই।


এবিষয়ে  নাজমা আক্তার জানান, আমি ত্রাণ দেয়ার নামে কিছু ভোটার আইডি (১১ টি) আইডি নিয়ে ব্যাংকে জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু বাকি ভুক্তভোগীদের ব্যাপারে আমি কিছুই জানিনা। তারা কার মাধ্যমে ম্যানেজার কে আইডি দিয়েছে তা বলতে পারবোনা। নাজমা আক্তার এও জানান - এরমধ্যে কয়েকজন ১ লাখ করে নিয়েছে তাও সত্যি যেমনঃ করিমগঞ্জ এর রিতা। আবার ইকরাসির মা মেয়ে সাথী ও মুন্নি  দুইজন নিয়েছে  ৫০ হাজার করে লোন,কিন্তু অসৎ প্রতারক ম্যানেজার তাদের নামে  হিসাবের খাতায় দেখিয়েছে ১ লক্ষ টাকা করে। নাজমা বেগম বলেন আমিও প্রতারণার শিকার হয়েছি ম্যানেজারের কথায় বিশ্বাস করে আমার খুব কাছের অসহায় গরীব মানুষদের কয়েকটি আইডির ফটো কপি দিয়ে। একটা আইডির ফটোকপি দিয়ে একটি সরকারি ব্যাংক থেকে এভাবে লক্ষ লক্ষ টাকা উঠিয়ে হাতিয়ে নেয়া যায় শুনে খুব অবাক হলাম। এই সুযোগে আমার দুই একজন প্রতিবেশী যাদের সাথে আমার পূর্ব শক্রতা চলছে তারাও ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেস্টা করে থানা পুলিশ এর মাধ্যমে আমাকে হয়রানির চেষ্টা করছে,এই মর্মে আমি ব্যাংকের ম্যানেজার ও কতিপয় দুস্ট চক্রদের নামে দোহার থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছি।

অগ্রণী ব্যাংকের আন্তা:বাহ্রা শাখার আওতার বাইরে দোহার উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে এমন নামের তালিকা প্রতিবেদকের হাতে আসে যারা কোন প্রকার ঋণ না পেয়ে ঋণের বোঝা বহন করছেন। এছাড়া ইকরাশি এলাকার জিয়াসমিন আক্তার জানান, তার স্বামী সফিউদ্দিন বিশ্বাস গত তিন বছর ধরে প্রবাসে অবস্থান করছেন। কিন্তু তার স্বামীর নামে চলতি বছরের ২২ নবেম্বর ১ লাখ টাকা ঋণ উত্তোলন দেখানো হয়েছে। অনিয়মের বিষয়ে অডিটের দায়িত্বে থাকা ব্যাংকটির প্রিন্সিপাল শাখার সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার সুব্রত কুমার রায় বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু অনিয়মের সত্যতা পেয়েছি। তবে কি পরিমানে অনিয়ম হয়েছে এখনো বলা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, আগামী চার দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে, আমরা আরও একটু সময় বাড়িয়ে নিয়েছি। অডিট শেষ হলে বিস্তারিত জানানো যাবে।


 

জালিয়াতির বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত হুমায়ূন কবিরের বর্তমান কর্মস্থল জয়পাড়া শাখায় গেলে ব্যাংকের এজিএম এসএম মহসিন জানান, অসুস্থতাজনিত কারণ দেখিয়ে হুমায়ূন কবির ১০ দিনের ছুটিতে আছেন। এব্যাপারে হুমায়ূন কবিরের মুঠোফোনে  ০১৭১৬৮৬৫৪৩৩ এই নাম্বারে একাধিকবার ফোন দিলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। কথিত আছে রাজধানী ঢাকার বাসাবোতে রয়েছে তার সুইচ্চ পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের এপার্টমেন্ট, আরও আছে দুর্নীতি আর অবৈধ উপায়ে কামানো সম্পদের পাহাড়।  চলবে -


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.

0 coment rios: